শিশির মাহমুদ
তদন্ত থেকে সাক্ষ্য নেওয়া শেষ পর্যন্ত একের পর এক নাটকীয় ঘটনার মধ্য দিয়ে চট্টগ্রামের আলোচিত একটি খুনের মামলার সলিল সমাধি ঘটেছে! মামলায় পুলিশের ক্রটিপূর্ণ তদন্ত ও গাফিলতির ছাপ স্পষ্ট। অন্যদিকে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা, পোস্টমর্টেম করা চিকিৎসক, ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ড করা ম্যাজিস্ট্রেটসহ গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীদের সাক্ষ্য না নিয়ে সাক্ষ্যগ্রহণ সমাপ্ত করায় রাষ্ট্রপক্ষের পদক্ষেপ নিয়ে ওঠেছে প্রশ্ন। এর মধ্যে খোদ বাদী-আসামির গোপন সমঝোতায় আইনী ফাঁকফোকরে পার পেয়ে যান ১৮ আসামি। এমনকি বাদী আসামিদের চেনেন না, ওসির কথায় এজাহারে স্বাক্ষর করেছেন। কোন আসামির নামও জানেন না বলে আদালতে সাক্ষী দিয়েছেন! এভাবেই চট্টগ্রামের প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নাসিম আহমেদ সোহেলকে ক্যাম্পাসে কুপিয়ে হত্যা মামলার ঘটে সলিল সমাধি!
যদিও ক্যাম্পাসে ভিকটিমকে মারধর ও খুন সংগঠিত করার ভিডিও ফুটেজ রয়েছে। খুনের জড়িত থাকায় বিশ^বিদ্যালয় থেকে বরখাস্ত করার প্রমাণ রয়েছে মামলার নথিতে। দোষ স্বীকার করে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে এক আসামি দিয়েছিলেন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও। তারপরও রেহাই পেয়ে যান আসামিরা।
খুনের মামলার বাদী ভিকটিম সোহেলের পিতা আবু তাহের বলেন, আসামিরা আমার ছেলেকে খুন করেছে এটা সত্য। আমার ছেলে আর কখনো ফিরে পারো না। আসামিরা আমার ছেলের পরিচিত ও ঘনিষ্ট ছিল-তাই তাদের মাপ করে দিয়েছি। তারা ১০ বছরতো কষ্ট পেয়েছেন। আসামিরা তরুণ ছেলে হওয়ায় তাদের জীবনটা নষ্ট হউক আমি চাইনি। তাই সাক্ষ্য দেওয়ার সময় তাদের ক্ষতি হবে- এমন সাক্ষ্য দেইনি।
অর্থের বিনিময়ে আসামিদের সঙ্গে সমঝোতা করেছেন এমন অভিযোগ ওঠা প্রসঙ্গে বাদী আবু তাহের বলেন, আসামিদের থেকে আমি কোন টাকা নিয়ে সমঝোতা করিনি। আসামিরা আমার কাছে বারবার মাপ চেয়েছেন। মানবিক দিক বিবেচনা করেই তাদের সাজা হউক এটা চাইনি। আসামিদের সঙ্গে বিচার চলাকালে ঘনিষ্ট যোগাযোগ ছিল বলে স্বীকার করেন বাদী নিজেই।
ট্রাইব্যুনালের পিপি এসইউএম নুরুল ইসলাম বলেন, বাদী আসামিদের সঙ্গে সমঝোতা করে আদালতে আসামিদের পক্ষে যায় সেইভাবে সাক্ষ্য দিয়েছেন। যেখানে বাদীই তার ছেলের খুনের বিচার চায় না, সেখানে রাষ্ট্রপক্ষের কী করার আছে? বাদী সাক্ষ্যে কোন আসামিকে চেনেন না, এজাহারে তিনি আসামির নাম দেননি, পুলিশ দিয়েছে সাক্ষ্য দিয়েছেন। সেখানে রাষ্ট্রপক্ষের মামলা প্রমাণ করার সুযোগ থাকে না। তবুও কয়েকজন নিরপেক্ষ সাক্ষীকে আদালতে উপস্থাপন করা হয়। তারাও বাদীর পথ অনুসরণ করে আসামিপক্ষে যায় এমন সাক্ষ্য দিয়েছেন। বাদীর সমঝোতার কারণে খুনের মামলার বিচার সঠিকভাবে হয়নি।
আদালতের ব্যঞ্চ সহকারি আবু ছায়েদ বলেন, বাদীপক্ষ মামলা পরিচালনায় শেষ দিকে এসে খুব অনিহা দেখাতেন। চার্জশিট দাখিল করা তদন্ত কর্মকর্তা, পোষ্টমর্টেম করা ডাক্তার, ম্যাজিস্ট্রেট সাক্ষীদের সাক্ষী দিতে আদালত থেকে ওয়ারেন্ট জারি করলেও কেউ সাক্ষী দিতে আদালতে হাজির হননি।
অপরাধবিষয়ক অভিজ্ঞ আইনজীবী জাফর ইকবাল বলেন, খুনের মামলা প্রমাণে বাদী ও রাষ্ট্রপক্ষ পরস্পরকে যুগলবন্দি হয়ে কাজ করতে হয়। এখানে একপক্ষ যদি সহযোগিতা না করে তাহলে মামলা প্রমাণ করা খুবই কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ খুনের মামলা প্রমাণ খুব সহজ, আবার খুবই কঠিন। সঠিক ও যথাযথভাবে তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করলে খুব সহজেই প্রমাণ করা সম্ভব। আর যদি সঠিকভাবে তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করা না হয় তাহলে খুনের ঘটনা প্রমাণ করা যায় না। আর বাদী আসামিদের পক্ষের হয়ে সাক্ষ্য দিলে বাদী বায়াস তা প্রমাণিত। মামলা প্রমাণ হবে কিভাবে?
চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাবেক পিপি অ্যাডভোকেট মেজবাহ উদ্দিন চৌধুরী বলেন, খুনের মামলায় বাদী, আসামির জবানবন্দি নেওয়া ম্যাজিস্ট্রেট, পোস্টমর্টেমকারী চিকিৎসক, চার্জশিট দেওয়া তদন্ত কর্মকর্তার স্বাক্ষ্য একটি মামলা প্রমাণের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এখানে যদি এদের সাক্ষ্য নেওয়া না হয় তাহলে রাষ্ট্রপক্ষ থেকে সঠিকভাবে বিচারিক কার্যক্রম পরিচালিত হয়নি। এখানেই সৃষ্টি হয়েছে আইনী ফাঁকফোকর। যার সুযোগ-সুবিধা নেয় বা পায় আসামিরা।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, সোহেল হত্যা মামলাটি পুলিশের তিন জন কর্মকর্তা এসআই হুমায়ন কবির, এসআই শাহ আলম ও সর্বশেষ তদন্ত করেন এসআই মুহাম্মদ আরিফ হোসাইন। প্রথম তদন্ত কর্মকর্তা হুমায়ন কবির আংশিক তদন্ত করেন। তিনি পুরো তদন্ত শেষ করার আগেই অন্যত্র বদলি হয়ে যান। কিন্তু যিনি পুরো তদন্ত করেননি তার সাক্ষ্য নিয়েই মামলার সাক্ষ্যগ্রহন সমাপ্ত করা হয়। যিনি পুরো তদন্ত শেষ করে আদালতে চার্জশিট দাখিল করেছেন, গুরুত্বপূর্ণ সেই তদন্ত কর্মকর্তা আরিফের সাক্ষ্যই নেওয়া হয়নি! এমনকি আসামির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ডকারী চট্টগ্রাম মেট্টোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আবদুল কাদেরের সাক্ষ্যও নেওয়া হয়নি মামলায়। মামলার আরেক গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী খুনের শিকার ব্যক্তির পোস্টমর্টেমকারী চিকিৎসক চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগ প্রভাষক ডা. মোহাম্মদ হাবিবুর রহমানের সাক্ষ্যও নেওয়া হয়নি। এভাবে গুরুত্বপূর্ণ একাধিক সাক্ষীর সাক্ষ্য না নিয়ে পদে পদে আইনী ফাঁকফোকর রেখে মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ করা হয়। যার সুযোগ নিয়ে সহজেই আসামিরা খালাস পেয়ে গেছেন বলে মনে করেছেন অপরাধ বিশেষজ্ঞ আইনজীবীরা।
এছাড়া পুলিশ তদন্তের সময় মারামারি ও খুনের ঘটনার বিশ^বিদ্যালয়ের সিসিটিভি ফুটেজ ও মোবাইলের ভিডিও ফুটেজ জব্ধ করলেও তদন্ত কর্মকর্তা ফরেনসিক পরীক্ষা করা হয়নি। এমনকি ভিডিও সনাক্তকারী কোন ব্যক্তিকে সাক্ষী করা হয়নি। সাক্ষ্যে বাদী ভিকটিমের আদালতকে বলেন, ‘হাসপাতালে গিয়ে আমার ছেলেকে মৃত দেখতে পাই। তখন আমি জ্ঞান হারাই। আমাকে তখন বাসায় নিয়ে যায়। পরে পুলিশ বাসায় গিয়ে আমাকে থানায় নিয়ে যায়। ওসি আমাকে ভার্সিটিতে মারামারি হয়েছে। আপনার ছেলে খুন হয়েছে। মামলা করতে হবে। এই কথা বলে এজাহারে স্বাক্ষর করতে বলে। আমি আসামীদের নাম জানি না। তাদের চিনি না।’ আরেক সাক্ষী প্রিমিয়ার বিশ^বিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক আহাম্মদ রাজিব চৌধুরী সাক্ষ্যে বলেন, ‘এজাহারে যাদের নাম এসেছে তারাসহ ২৩ ছাত্রকে এ ঘটনায় বিশ^বিদ্যালয়ের অভ্যান্তরীণ তদন্ত কমিটির রিপোর্টে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে সুপারিশ করে আমরা তদন্ত কমিটি রিপোর্ট জমা দিয়েছি। এর বেশি কিছু জানি না।’
আদালত সূত্রে জানা গেছে, ২০১৬ সালের ২৯ মার্চ চট্টগ্রামের প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদায় অনুষ্ঠান নিয়ে বিরোধের জেরে ওয়াসা ক্যাম্পাসে ছুরিকাঘাতে খুন হন শিক্ষার্থী সোহেল। ২০২৩ সালের ১৪ জুন আদালতে ১৮ আসামিকে অভিযুক্ত করে চার্জশিট দাখিল করে পুলিশ। তারা হলেন- ওয়াহিদ জামাল নিশান, জিয়াউল হায়দার চৌধুরী, এসএম গোলাম মোস্তফা, তামিম উল আলম, কাজী মো. জয়নাল আবেদিন, আবু তাহের উজ্জল, নুরুল ফয়সাল, রাশেদুল হক, আবু ফয়েজ, সাইফুদ্দিন সাইফ, সাইফুল ইসলাম সাবিক, ইব্রাহিম সোহান, সাইফুল তারেক চৌধুরী, বাদশা সোলায়মান, মো. আসিফ, শামীম আজাদ মুন্না, নাজমুল হক ও আসলাম। মামলায় ১৩ জনের সাক্ষ্য নেয় আদালত। তারপর সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে গত ১৫ মার্চ অপরাধ প্রমাণিত না হওয়ায় ১৮ আসামিকে বেকুসর খালাস দেয় চট্টগ্রাম বিভাগীয় দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল।
Leave a Reply